Voice Bangladesh প্রকৌশলীর উদাসীনতা, জটিলতা আর অনিয়মে থমকে রাজধানীর ১৫৬ স্কুল প্রকল্প - Voice Bangladesh

প্রকৌশলীর উদাসীনতা, জটিলতা আর অনিয়মে থমকে রাজধানীর ১৫৬ স্কুল প্রকল্প


ভয়েস বাংলাদেশ ডেস্ক মার্চ ২৯, ২০২৬, ৯:৪০ অপরাহ্ণ
প্রকৌশলীর উদাসীনতা, জটিলতা আর অনিয়মে থমকে রাজধানীর ১৫৬ স্কুল প্রকল্প

৬ বছরে শেষ মাত্র ২০টি; জমি বিরোধ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির অভিযোগে অনিশ্চয়তায় শিক্ষা অবকাঠামো

রাজধানী ঢাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া বৃহৎ প্রকল্পটি এখন কার্যত ধীরগতির এক দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। পরিকল্পনার ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ১৫৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ২০টির কাজ শেষ হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৌশলীদের উদাসীনতা, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ-সব মিলিয়ে প্রকল্পটি এখন নানা সংকটে জর্জরিত।

প্রকল্পের কাঠামো ও অগ্রগতি

২০২০ সালে শুরু হওয়া “ঢাকা মহানগরী ও পূর্বাচলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ দৃষ্টিনন্দনকরণ (১ম সংশোধিত)” প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ ছিল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে করোনা পরিস্থিতিতে কাজের গতি কমে যাওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

এই প্রকল্পে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৭২ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যার মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করছে ১৩৩৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৫৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩২টি পুনর্নির্মাণ, ১৪টি নতুন নির্মাণ এবং ১০টি মেরামতের কথা রয়েছে।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এখন পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ১৭ শতাংশ। মাঠপর্যায়ে ৮২টি বিদ্যালয়ের কাজ চলমান থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলোর অগ্রগতি অর্ধেকের কাছাকাছি।

জমি জটিলতায় থেমে থাকা বিদ্যালয়

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্তত ১০টি বিদ্যালয়ের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এই জটিলতায়।

রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় অবস্থিত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একই প্রাঙ্গণে থাকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সেখানে খেলার মাঠ করার দাবি ওঠে। এতে নির্মাণকাজ থেমে যায়।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকা জান্নাতুন নাঈমা জানান, ভবন না থাকায় শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১৮০-তে।

একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে বিমানবন্দর থানা এলাকার শৈলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। জমির মালিক বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আপত্তি জানানোয় নতুন ভবনের কাজ শুরু করা যায়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রাবেয়া বেগম বলেন, পুরনো ভবন ভেঙে ফেলার পর থেকে পাশের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে ক্লাস চলছে। বিকেলে ক্লাস হওয়ায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। গত বছরের ৪৫০ শিক্ষার্থী থেকে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮০-তে।

পশ্চিম ভাষানটেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে নির্মাণকাজ আটকে আছে।

প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতা

প্রকল্প পরিচালক সাইফুর রহমান তাঁর অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, একাধিক পর্যালোচনা সভা হলেও কম অগ্রগতি সম্পন্ন কাজগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীরা সভায় উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যাচ্ছে না এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।

বাজেট কমলেও ব্যয় অত্যন্ত সীমিত

২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ ছিল ৪৫০ কোটি টাকা। কাজের ধীরগতির কারণে তা সংশোধন করে ২৭১ কোটি ২০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
কিন্তু এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র প্রায় ৩৫ কোটি টাকা, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।

অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। রাজধানীর গাবতলী এলাকায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে তৃতীয় ও চতুর্থ তলার কাজ সম্পন্ন না হলেও তা সম্পন্ন দেখিয়ে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

বদলি হলেও দায়িত্বে বহাল

অভিযোগের পর এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদরদপ্তরে সংযুক্ত করা হলেও এক মাসের মধ্যে আবার আগের পদে ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে তদন্ত চলমান থাকলেও তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী জোনায়েত আলম জানান, এখন পর্যন্ত ২০টি বিদ্যালয়ের কাজ শেষ হয়েছে এবং আগামী জুনের মধ্যে আরও ২০টি শেষ হওয়ার আশা রয়েছে। তবে জমি জটিলতার কারণে অন্তত ১০টি বিদ্যালয়ের কাজ বন্ধ রয়েছে।

উপ-প্রকল্প পরিচালক এস এম মোর্শেদ বলেন, প্রকল্পের গতি বাড়াতে বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে নিয়মিত তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া দাবি করেন, ঢাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা, বৃষ্টি, নির্বাচন, ডিজাইন পরিবর্তন এবং জমি জটিলতার কারণে কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, এটি একটি চ্যালেঞ্জিং প্রকল্প এবং নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। গাবতলীর ঘটনায়ও তিনি দাবি করেন, বাস্তবে কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।

এ বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেন বলেন, প্রকল্পের ধীরগতি ও অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকার বিষয়েও তিনি সমস্যা দেখছেন না।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনিশ্চয়তায় শিক্ষা অবকাঠামো

সব মিলিয়ে রাজধানীর প্রাথমিক শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি এখন নানা জটিলতা ও সমন্বয়হীনতার মধ্যে পড়ে অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না-আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর।