
বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা দুর্নীতির এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি আইটি প্রতিষ্ঠান-‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমস লিমিটেড’ (সিএনএস)। অভিযোগ বলছে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগসাজশ এবং পরিকল্পিত অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে সরকারি প্রকল্পে একচেটিয়া দখল কায়েম করে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ঘটিয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের প্রভাব বলয়ের কিছু ব্যক্তি ও অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় সিএনএস বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে আধিপত্য বিস্তার করে-এমন অভিযোগ উঠে এসেছে বিভিন্ন নথি ও অনুসন্ধানে।
টোল আদায়ে অনিয়ম: প্রতিযোগিতা ছাড়া চুক্তি –
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি ক্রয় বিধি (পিপিআর) উপেক্ষা করে ২০১৬ সালে মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল আদায়ের কাজ সিএনএস-কে দেওয়া হয়। উন্মুক্ত দরপত্র বাতিল করে একক উৎস থেকে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চুক্তি অনুযায়ী মোট টোল আদায়ের ওপর ১৭.৭৫ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ করা হয়, যা প্রচলিত আর্থিক কাঠামোর তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। এর ফলে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪৮৯ কোটি টাকা আদায় করে সিএনএস, যেখানে সরকারের সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩০৯ কোটি টাকা।
একই ধরণের অনিয়ম দেখা গেছে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুতেও। প্রাথমিকভাবে মাত্র ৬ মাসের জন্য দায়িত্ব পেলেও, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮ বছর ধরে টোল আদায়ের কাজ চালিয়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর একাধিক প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার কাজ তাদের হাতে যায়।
দরপত্রে কৌশলী বাধা, একক আধিপত্য:
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পে এমন শর্ত আরোপ করা হতো যাতে সিএনএস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ভেঙে পড়ে এবং প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প তারা প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লাভ করে।
এই প্রক্রিয়ায় অতিমূল্যায়ন, অস্বচ্ছতা এবং পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতা পরিহারের বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আদালতের রিট: প্রকল্প ধরে রাখার অস্ত্র-
সিএনএস-এর আরেকটি কৌশল ছিল আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করা। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বা নতুন দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রতিষ্ঠানটি আদালতে রিট দায়ের করত। এর মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘায়িত করে বছরের পর বছর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
এর ফলে সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে অটোমেশন প্রকল্পে অনিয়ম:
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অটোমেশন প্রকল্পে সিএনএস-এর ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ প্রায় ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকার চুক্তিতে ৫ বছরের জন্য কাজটি পায় প্রতিষ্ঠানটি, যার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৪ সালের মার্চে।
কিন্তু বন্দরের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় থাকা বিভিন্ন মডিউল পরিচালনার কাজ তারা হঠাৎ বন্ধ করে দেয়, যা বন্দরের কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষকে আলাদা কমিটি গঠন করতে হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ৬১ জন জনবল নিয়োগের কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়োগ দেওয়া হয় মাত্র ৪১ জন। তারপরও তারা ৩ বছরে ১১ কোটির বেশি টাকা বিল দাবি করে। যাচাই-বাছাই শেষে ৪১ জনের আংশিক সময়ের জন্য প্রায় ২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এছাড়া মাসিক প্রায় ২৬ লাখ টাকার মেইনটেন্যান্স বিলও নির্ধারণের প্রস্তাব ওঠে। অন্যদিকে, বিদেশ সফর না হওয়া সত্ত্বেও সেই খাতে বরাদ্দ অর্থ দাবি করার ঘটনাও ধরা পড়ে, যা পরবর্তীতে কর্তন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একটি বিল সামারি অনুযায়ী, প্রায় ৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার বিল প্রক্রিয়াধীন ছিল-যার বড় অংশই অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উদ্বেগের বিষয়: এখনো সক্রিয় প্রভাব-
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো-এই চক্রের প্রভাব এখনও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি বলে বিভিন্ন মহল থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। অতীতের অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরণের অপব্যবহার অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
এই পুরো ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনি ব্যবস্থার অপব্যবহার মিলেই কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে বিপুল অর্থ আহরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন দেখার বিষয়-এই অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায় নির্ধারণ কতদূর এগোয়।
আপনার মতামত লিখুন :