
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর মার্কিন নৌ অবরোধ এবং তেহরানের অনড় অবস্থানের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুট হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থা কাটছে না।
হরমুজ প্রণালিতে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উপকরণ সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করে বলেছে, এমন অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতি ‘মহাবিপর্যয়’-এর সম্মুখীন হতে পারে।
মঙ্গলবার আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের এই সংস্থাটি প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো সোমবার এক সাক্ষাৎকারে বৈশ্বিক খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বিদ্যমান মজুদ উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের এই ধাক্কা সামলে নিচ্ছে বলে খাদ্যমূল্য এখনো বাড়েনি।
ম্যাক্সিমোর সঙ্গে থাকা এফএও’র কৃষি-খাদ্য অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক ডেভিড লাবোর্দে যোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে জ্বালানি ও সারের সংকটের কারণে বছরের শেষ ভাগে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত ভোগ্যপণ্য ও খুচরা দামে উল্লম্ফন ঘটতে পারে।
এফএও এর মতে, ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ কৃষি-খাদ্য উৎপাদন উপকরণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়।
লাবোর্দে বলেন, “আমরা এখন বিভিন্ন উপকরণ সংকটের মধ্যে আছি। এটিকে ‘মহাবিপর্যয়ে’ পরিণত করতে আমরা চাই না। তবে পার্থক্যটি নির্ভর করবে আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি তার ওপর।”
ম্যাক্সিমো বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কোনো খাদ্য সংকট নেই; কারণ প্রাপ্যতা রয়েছে। একটি ভালো ফসলের মৌসুমের কারণে প্রচুর সরবরাহ থাকায় গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধি এখনো রুটি এবং গমের মতো খাদ্যপণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়নি। কিন্তু এটা শুধুমাত্র বর্তমান পরিস্থিতি।”
সার পরিস্থিতি
কৃষি উৎপাদনে বিশ্বে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক এবং অন্য সারের বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বৈশ্বিক কৃষিকে ‘অত্যন্ত অরক্ষিত’ অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহ এবং জাহাজ চলাচলে সাম্প্রতিক বিঘ্ন ইতোমধ্যে উপসাগরীয় এবং তার বাইরের সার কারখানাগুলোকে (সার তৈরির জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে) উৎপাদন বন্ধ বা কমাতে বাধ্য করেছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, “যদি এই গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে (হরমুজ প্রণালি) যাতায়াত স্থবির থাকে, তাহলে কৃষকরা কম সার ব্যবহার করে উৎপাদন করতে বাধ্য হবেন। অথবা তারা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন।
“এ কারণেই যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল একটি যুদ্ধবিরতিই নয়, বরং জাহাজ চলাচল শুরু হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ চাষাবাদের পঞ্জিকা অনুযায়ী কৃষি উপকরণ পেতে দেরি হলে তা উৎপাদন হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতিতে রূপ নিতে পারে।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান সে সময় থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
এক মাসের বেশি সময় ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ এবং আরব দেশগুলোতে ইরানের ‘প্রতিশোধমূলক’ হামলা অব্যাহত ছিল। জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
শনিবার ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিরা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা করেও কোনো সমাধান আসতে ব্যর্থ হন।
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেন, যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :